যে কোনো সংগঠন চলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সংবিধান বিসিবির গঠনতন্ত্র। এই গঠনতন্ত্রে পরিচালকদের অপসারণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। মৃত্যু, স্থায়ী বিদেশ গমন, টানা মিটিংয়ে অনুপস্থিত, অন্য ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটিতে থাকা ছাড়া কোনো পরিচালক ব্যক্তিগত ইচ্ছায় পদত্যাগ না করলে অপসারণযোগ্য নয়। সাবেক সভাপতি ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চিঠি দিয়েছিলেন কয়েকজন পরিচালক।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সেই চিঠির প্রেক্ষিতে ফারুক আহমেদের পরিচালক মনোনয়ন প্রত্যাহার করে। ঐ সময় ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অনেকেই সেটা গঠনতন্ত্র বর্হিভূত বলে উল্লেখ করেছিলেন। আবার ফারুক আহমেদ ও নাজমুল আবেদীন ফাহিম ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে যখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কোটায় পরিচালক মনোনীত হন তখন ঐ সময় জালাল ইউনূস পদত্যাগ করলেও আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি পদত্যাগ করেননি। তাকেও সরিয়ে দিয়েছিল এনএসসি।
গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিসিবির নির্বাচিত কমিটির পরিবর্তে অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আইনবলে এটা সম্মত। তবে বিসিবির গঠনতন্ত্রে অ্যাডহক কমিটির কোনো বিধান নেই।
কেমন হয়েছে তামিমের অ্যাডহক কমিটি
তামিম ইকবালের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এই কমিটির মধ্যে প্রকৃত অর্থে সংগঠক রফিকুল ইসলাম বাবু। ফাহিম সিনহা, সালমান ইস্পাহানি,তানজিল চৌধুরী তারা দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী,ক্রিকেট পৃষ্টপোষক এবং ক্রিকেটের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত রয়েছেন। তামিম ইকবাল ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা মোহামেডানের হয়ে খেলেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণাও দেননি সেভাবে। তবে গত বছর নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠক হিসেবে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন।
এই কমিটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় মন্ত্রীপুত্রদের আগমনে। গত নির্বাচন থেকেই তামিম ইকবাল জোটে ছিলেন ইস্রাফিল খসরু,সৈয়দ ইব্রাহীম আহমেদ ও ইয়াসির আব্বাস। জাতীয় নির্বাচনের পর তাদের দুই জনের বাবা সরাসরি মন্ত্রী হয়েছেন আরেকজন মন্ত্রী পদমর্যাদা। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক ক্রীড়াঙ্গন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অ্যাডহক কমিটি গঠন করেছে। সেই অ্যাডহক কমিটিতে তিন মন্ত্রীর ছেলে ও আরেক মন্ত্রীর স্ত্রী থাকায় ক্রীড়াঙ্গন ছাপিয়ে সামাজিক-নাগরিক জীবনেও আলোচনা চলছে।
অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের নির্বাচন কি নৈতিক?
বিসিবির গঠনতন্ত্রেই নেই অ্যাডহক কমিটি। ফলে অ্যাডহক কমিটির ব্যক্তিবর্গ নির্বাচন করতে পারবে কি না এই জাতীয় বিষয় বিসিবির কোনো নির্দেশনা নেই। সকল ফেডারেশনের অভিভাবক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। সেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদেও এই সংক্রান্ত বিষয়ে তেমন কিছু নেই। বিগত সময়ে অনেক ফেডারেশনের নির্বাচনে দেখা গেছে, অ্যাডহক কমিটির মধ্যে যারা নির্বাচন করতে চান তারা পদত্যাগ করে পরবর্তীতে নির্বাচনে প্রার্থী হন।
অ্যাডহক কমিটির সবচেয়ে বড় কাজ নির্বাচন আয়োজন করা। তামিম ইকবালদের কমিটিকে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যাদের নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব তারাই যদি আবার নির্বাচনের প্রার্থী হন তখন সেটা স্বার্থের সংঘাতের মতো। কারণ অ্যাডহক কমিটিতে যারা থাকবেন তারাই কাউন্সিলরশীপ অনুমোদন দেবেন। আইনগত বাধা নেই তবে অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া খানিকটা যার যার নৈতিকতার বিষয়।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে নেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ
গত বছর বিসিবির নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক সেই নির্বাচনের অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কমিটি করেন। সেই কমিটি দিন তিনেক আগে রিপোর্ট দিয়েছে। সেই রিপোর্টে তদন্ত কমিটি বিসিবির নির্বাচনে তিন ক্যাটাগরিতেই ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। অথচ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দুই পরিচালক মনোনয়ন ছিল সবচেয়ে বড় প্রশ্নবিদ্ধ। এই বিষয়টি এড়িয়েই গেছে।
বিসিবির পরিচালক হতে হলে কাউন্সিলর হতে হয়। সর্বশেষ নির্বাচনে ভোটার তালিকায় নাম না থাকা দুই জন বিসিবির পরিচালক হয়েছেন। ভোটগ্রহণ শেষে দুই জন কাউন্সিলর পদত্যাগ করেছেন। সেই পদত্যাগের পর আবার নতুন কাউন্সিলর দিয়েছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। পরবর্তীতে তারা পরিচালক হয়েছেন। এই প্রক্রিয়া পুরোটাই প্রশ্নবিদ্ধ। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নির্বাচন কমিশন এনএসসির দুই জন পরিচালকের নাম ঘোষণা করেছেন যখন তারা কাউন্সিলরও হননি।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দুই পরিচালকের বিষয়টি আসেনি। তদন্ত কমিটি বিসিবি নির্বাচন নিয়ে একাধিক সুপারিশ দিয়েছে। সেই সুপারিশে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নিয়ে কোনো মন্তব্য বা পর্যবেক্ষণ নেই।
ফারুক-বুলবুল-তামিম সবারই চেয়ার চাই
গত দেড় বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির চেয়ার বসেছেন জাতীয় দলের সাবেক তিন অধিনায়ক। সবাই মুখে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা ও নিবেদেনর কথা উল্লেখ করেন। বাস্তবে সবারই লক্ষ্য বিসিবি সভাপতিরই চেয়ার। ফারুক আহমেদ ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রভাবেই বিসিবি সভাপতি হয়েছেন। পরবর্তীতে সরকারই তার ওপর নাখোশ হয়ে তাকে অপসারণ করেছে। অপসারণের পর ফারুক আহমেদ ক্রিকেট বোর্ডের সেই সময়ের পরিচালক মাহবুব আনাম, ফাহিম সিনহা ও ইফতেখার মিঠুর কড়া সমালোচনা করে বলেছিলেন,‘ক্রিকেট বোর্ডে নিশ্চয়ই মধু আছে’। এমনকি তিনি যার বদৌলতে বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন সেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও সমালোচনা করতে পিছপা হননি ফারুক। ফারুক এটি গঠনতন্ত্র ও আইন বর্হিভূত হিসেবে মামলাও করেছিলেন। এত ব্যক্তিত্ব দেখালেও পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই আবার তার আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে সুস্পমর্ক হয়। বিসিবি নির্বাচন করেন। সেই ইফতেষার মিঠুর সঙ্গেই চার মাস এক বোর্ডে ছিলেন।
আমিনুল ইসলাম বুলবুল আকস্মিকভাবে বিসিবি সভাপতি হয়েছিলেন। তিনি সভাপতি হওয়ার পর বলেছিলেন টি টোয়েন্টি ইনিংস খেলতে এসেছেন। স্বল্প মেয়াদে কাজ করে আবার আইসিসিতে ফিরে যাবেন। পরবর্তীতে তিনি চার বছর বিসিবি সভাপতি পদে থাকার জন্য নির্বাচন করেন। নির্বাচিত হওয়ার জন্য নানা প্রশ্নবিদ্ধ কাজে জড়ান। যা তার ক্রিকেটার ও ব্যক্তি পরিচয়ের সঙ্গে যায় না। বুলবুল দীর্ঘদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। এরপরও প্রায় এক বছর বিসিবি সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতার পালাবদলে ফেডারেশনে রদবদল ঘটবেই। বুলবুল এরপরও বলেছেন তিনি শেষ ব্যক্তি হিসেবে চেয়ারে থাকবেন যা তার পদের প্রতি তীব্র আকর্ষণই।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা হওয়ার পর বিসিবিতে প্রথম যেদিন যান সেদিন বিসিবির কেউ না হয়েও তামিম ইকবাল ছিলেন তার সঙ্গে। উপদেষ্টা ফুটবল, ক্রিকেট যখন যে ক্রীড়া অনুষ্ঠানে গেছেন অধিকাংশ সময় তামিম পাশে ছিলেন। প্রায় এক বছর সুস্পমর্ক থাকার পর আসিফের সঙ্গে তামিমের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে বিসিবির সভাপতির পদ ও নির্বাচন নিয়েই। পরবর্তীতে বিসিবির নির্বাচন নিয়ে তামিম আসিফের সমালোচনা করেছেন নানা সময়। অবশেষে তামিম অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হয়েছেন। যার দায়িত্ব মূলত সুষ্ঠু নির্বাচন করা। দায়িত্ব নেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই তিনি সুস্পষ্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে ফারুক-বুলবুলের মতো তারও চেয়ারই দরকার।



আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)