রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২
ফাইল ছবি
বাংলাদেশের ভারত্তোলনের সবচেয়ে সফল ও পরিচিত মুখ মাবিয়া আক্তার সীমান্ত। ২০১৬ ও ২০১৯ সালে এসএ গেমসে স্বর্ণ জিতেছিলেন। বিশেষ করে ২০১৬ সালে কিশোরী মাবিয়ার স্বর্ণ জয়ের পর কান্নার ছবি পুরো দেশবাসীকে স্পর্শ করেছিল।
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি কিংবা এশিয়ান অলিম্পিক কাউন্সিলের আওতায় প্রতিযোগিতাগুলোতে ক্রীড়াবিদদের ডোপ টেস্ট করা হয়। নভেম্বরে ইসলামিক সলিডারিটি গেমস শুরুর আগে ভারত্তোলক মাবিয়ার নমুনা ২৯ অক্টোবর ঢাকায় নেওয়া হয়। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সেই নমুনায় ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ওয়ার্ল্ড এন্টি ডোপিং এজেন্সি (ওয়াডা)। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন মাবিয়াকে সেই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। এই শাস্তি কার্যকর হয়েছে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে।
অনাকাঙ্ক্ষিত এই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করবেন ভারত্তোলক মাবিয়া, ‘বৃহস্পতিবার অলিম্পিক থেকে আমি চিঠি পেয়েছি। ১৪ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে এমনটা চিঠিতে লেখা আছে। আমি আপিল করব।’ মাবিয়া গত এক যুগে অনেক আন্তর্জাতিক গেমস ও টুর্নামেন্টে খেলেছেন। অসংখ্যবার ডোপ টেস্টের জন্য নমুনা দিয়েছেন। কখনও পজিটিভ হননি। এবার এরকম বিপত্তি হওয়ার কারণ ওষুধ গ্রহণ। যা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব সময় বলা হয়েছে একটা নাপা খেলেও যেন ডাক্তারের পেসক্রিপশন থাকে। পেসক্রিপশন ছাড়া কোনও ওষুধ যেন না খাওয়া হয়। আমার পা ব্যথা ও ফোলা ছিল। এজন্য ওষুধ খেয়েছি, সেটার পেসক্রিপশনও ছিল।’
মাবিয়া ডারউইক্স জাতীয় ওষুধ সেবন করেছিল। যা রক্তচাপ কমানো, হৃদযন্ত্রের ফেলিওর, শরীর থেকে পানি বের করার জন্য অনেক সময় চিকিৎসকরা দিয়ে থাকেন। শারীরিক কারণে এটা মাবিয়ার প্রয়োজন থাকলেও ভারত্তোলনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে কারণে তাকে এই শাস্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে।
এন্টি ডোপিং নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করা চিকিৎসক এই বিষয়ে বলছেন, ‘খেলা ও নিজের স্বাস্থ্যের মধ্যে অবশ্যই স্বাস্থ্য আগে, ফলে কোনো ক্রীড়াবিদের স্বাস্থ্যগত কারণে যদি কোনো ওষুধ খেতে হয় যেটা ডোপিং লিস্টের মধ্যে রয়েছে, তখন সেটা সংশ্লিষ্ট ফেডারেশন কিংবা এন্টি ডোপিং কমিটির ডাক্তারকে জানাতে হয়। তখন তারা আন্তর্জাতিক ডোপিং, ফেডারেশন অথবা সংশ্লিষ্ট গেমসের ডাক্তারদের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করবে। তারা যদি অনুমতি দেয় তখনই কেবল সেই ওষুধ সেবন করা যাবে, অন্যথায় নয়।’
ভারত্তোলন ফেডারেশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত অভিজ্ঞ সংগঠক। মাবিয়া আক্তার সীমান্ত তার হাতেই গড়া ভারত্তোলক। মাবিয়ার এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি ফেডারেশন জানে না। এটি সম্পূর্ণ তার এবং অলিম্পিকের বিষয়।’
বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের অনেকেই ডোপিং সম্পর্কে তেমন জ্ঞাত নন। বিশেষ করে মাবিয়ার এই ঘটনা তারই প্রতিচ্ছবি। গেমসের আগে খেলোয়াড়রা অলিম্পিকের অধীনে থাকে। সেই সময় খেলোয়াড়রা কোন ওষুধ গ্রহণ করছে সেটা অলিম্পিকের চিকিৎসকের জানা থাকা বাঞ্ছনীয়। মাবিয়ার দাবি– তার প্রেসক্রিপশন দেখাই হয়নি এবং বিদেশে অসংখ্যবার টেস্টে তিনি কখনও পজিটিভ হননি। এবার দেশের নমুনায়নে পজিটিভ। আবার চিকিৎসকের দাবি– ওসিএ’র অধীনের খেলাগুলোতে এন্টি ডোপিং এডুকেশন আবশ্যক, ফলে ক্রীড়াবিদরা জ্ঞাত এই বিষয়ে এবং ওয়াডার সার্টিফাইড ব্যক্তিগণই নির্দেশনা অনুযায়ী নমুনা গ্রহণ করেছে।
ঘরোয়া ক্রিকেট এবং আরও কিছু খেলায় মাঝে-মধ্যে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে এরকম নিষেধাজ্ঞা এবারই প্রথম। তাই বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা এই বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য খুব খারাপ একটি ঘটনা ঘটল। এই বছর এশিয়ান বিচ, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস মিলিয়ে অনেক খেলা রয়েছে। প্রতি গেমসের আগে খেলোয়াড় ও চিকিৎসকরা সরাসরি সেশন করবে। যাতে কোনো গ্যাপ না থাকে। ওয়াডা এখন শুধু খেলোয়াড় নয়, কোচ-ম্যানেজারকেও শাস্তি দেয়। তাই গেমসে অংশগ্রহণকারী সংশ্লিষ্ট সকলকেই এই বিষয়ে সচেতন করব।’
মাবিয়া শুধু ভারত্তোলনই নয়, বাংলাদেশের নারী সমাজের একজন উজ্জ্বল মুখ। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়েও দেশকে সাফল্য এনে দিয়েছেন। দুই বছরের এই নিষেধাজ্ঞা তার জন্য খুবই শঙ্কার। মাবিয়া আপিল করতে চাইলেও সেটা বেশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। নমুনায় পজিটিভ আসার পর ওষুধ গ্রহণের বিষয় ও পেসক্রিপশন প্রদর্শন করে তিনি স্বীকার করেছেন। সে অনুযায়ী তার শাস্তি হয়েছে ফলে পুনরায় আপিল করলে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটাই দেখার বিষয়। দু’বার গেমসে স্বর্ণ এনে দেওয়া ভারত্তোলক মাবিয়ার এই সংকটে অলিম্পিক কীভাবে পাশে দাঁড়ায় সেটাও দেখার বিষয়।
ভারত্তোলন ফেডারেশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সে দেশের একজন সম্পদ। এই পরিস্থিতিতে তাকে মানসিকভাবে সহায়তা করা হবে। তিনি যেন একা অনুশীলন করতে পারেন সেই ব্যবস্থা থাকবে। তার বয়স ২৭ বছরের কম, ফলে আর দেড় বছর পর হলেও যেন খেলায় ফিরতে পারে।’
আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াডার প্রধান কার্যালয় কানাডায়। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ও ১৪০ দেশের অর্থায়নে ওয়াডা পরিচালিত হয়। ওয়াডা প্রণীত নির্দেশনা অনুযায়ী ক্রীড়াবিদদের ডোপিং টেস্ট দিতে হয়। ডোপিং পজিটিভ হলে শাস্তি হয় কোডের ধারা অনুযায়ী। আর ওয়াডার শাস্তির সুপারিশ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।)